যুক্তরাস্ট্রের দক্ষিন-পুর্বাঞ্চলীয় কন্সুলেট আটলান্টায় চাই

55

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশ সরকারের একটি কনস্যুলেট অফিস স্থাপিত হচ্ছে। খবরটি জেনে পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্যের প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সোচ্চার হয়েছেন দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর ও প্রবেশদ্বার খ্যাত শহর আটলান্টায় কনস্যুলেট স্থাপনের দাবীতে।

দেশের শেষ প্রান্তের ফ্লোরিডার মায়ামীতে কন্সুলেট স্থাপনের সিদ্ধান্তটি যে একেবারেই অর্থহীন, তা যে কোন বিবেকবান মানুষের কাছেই পরিস্কার। বরং এটি মধ্যবর্তী শহর আটলান্টায় হলে ভৌগোলিক বিবেচনায় ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, টেনেসি, আলাবামা, নর্থ ক্যারোলিনা ও সাউথ ক্যারোলিনা- এই ছয় রাজ্যের বাংলাদেশিরা সেবা পেতে পারে সুবিধাজনক দূরত্বের মধ্যে থেকে।

অন্যদিকে ফ্লোরিডার মায়ামীতে কন্সুলেট হলে কেবলমাত্র সেই রাজ্যের অধিবাসিরাই যে সেবা পাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। দৃশ্যতঃ বাকী পাচ রাজ্যের মানুষের পক্ষে এতো লম্বা পথ মাড়িয়ে কিংবা বাড়তি পয়সা খরচ করে প্লেনে উড়ে এই প্রতীক্ষিত সেবা নিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে।

সরকারের যদি ফ্লোরিডা ও জর্জিয়া দুই রাজ্যেই কন্সুলেট স্থাপনের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সেটি হবে আনন্দের কথা, এতে আমাদের কোনই সমস্যা নেই। কিন্তু এই মুহুর্তে যদি একটি শহরেই এই কন্সুলেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনাতে আটলান্টাতেই এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জোরালো এবং যুক্তিসংগত দাবী রাখে।

জর্জিয়ার আটলান্টা যে সত্যি সত্যি একটি যুতসই শহর কন্সুলেট স্থাপনের ব্যাপারে, তার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে এই শহরে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সোনালী একচেঞ্জ। গত দশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শাখাগুলির চাইতে আটলান্টা শাখা সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আয় করে যাচ্ছে আর গত তিন বছর ধরে এই রেমিটেন্সের পরিমান এক বিলয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে অর্থাৎ এক্ষেত্রেও অবস্থানের দিক থেকে সুবিধাজনক দূরত্বের মধ্যে হওয়ায় ছয়টি রাজ্যের প্রবাসী বাংলাদেশি সাচ্ছন্দে তাদের সেবা গ্রহণ করছেন এই সোনালী একচেঞ্জের শাখার মাধ্যমে। এখানে বলা প্রয়োজন, সোনালী একচেঞ্জ স্থাপনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ জরীপের মাধ্যমেই কিন্ত ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শাখা খুলেছিল, যা ছিল নিঃসন্দেহে সঠিক সিদ্ধান্তেরই ফসল।

আবার আরও একটি উদাহরণ হিসেবে ভ্রাম্যমান দূতাবাসের কথাই ধরা যাক নে কেন ! এক্ষেত্রেও পুরো যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বাংলাদেশি অধ্যুষিত শহরে এই ভ্রাম্যমান সেবা কার্যক্রম চলে, সেসবের মধ্যেও আটলান্টার ভ্রাম্যমান দূতাবাসের সেবা প্রদানের হার সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকছে অধিকাংশ সময়ই। অথচ স্থায়ী কন্সুলেট স্থাপনের ব্যাপারে হঠাৎ করে জর্জিয়া রাজ্যের নামটি বাদ পড়ে কেনই বা দক্ষিণ-পুর্বের সর্বশেষ প্রান্তের ফ্লোরিডায় ছিটকে পড়লো, এটা অনুধাবন করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ওই অঞ্চলের নামীদামী স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের লবিং বা তদবিরের কারনেই এই সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। অথচ অধিক মানুষের সেবা প্রদানের স্থানকে উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কম মানুষের সেবা প্রদানে সরকারী অর্থ ব্যয় আদৌ কতটা ন্যায়সংগত সেটি ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করেন নি কেউ।

মনে পড়ে, ২০১৪ কি ২০১৫ সালের দিকে আটলান্টায় একবার ভ্রাম্যমান দুতাবাসের সেবা দিতে এসে ওয়াশিংটন ডি সি থেকে মিনিস্টার (কন্সুলার)-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল হক কাজের ফাঁকে বলছিলেন যে, ভৌগোলিক বিবেচনায় জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা হচ্ছে বেস্ট প্লেস, যেখান থেকে ফ্লোরিডাসহ আশপাশের অন্যান্য পাঁচ কি ছয়টি রাজ্যের প্রবাসীরা খুব সহজেই সেবা নিতে পারবে। কাজেই আমরা যদি কর্তৃপক্ষ বরাবর এই শহরে স্থায়ী কন্সুলেট স্থাপনের আবেদন করি, তবে তিনি জোরালো সুপারিশ করবেন।

আজ শামসুল হক সাহেবের সেই আশ্বাসের কথা মনে হতেই দেখতে পাচ্ছি, আমাদের চিন্তা-চেতনার ভেতরে হয়তো ভালো-মন্দের গ্রহণযোগ্যতা বলে আর কিছুই নেই। তা না হলে, আজকের দিনে যেখানে কেবল জর্জিয়া রাজ্যেই প্রায় চল্লিশ হাজার বাংলাদেশি বাস করেন, যা ফ্লোরিডা রাজ্যের বাংলাদেশিদের তুলনায় প্রায় দিগুনেরও বেশি, সেই অঞ্চলে কন্সুলেট না হয়ে হতে যাচ্ছে দেশের শেষ প্রান্তে যার সাথে এতগুলো রাজ্যের প্রবাসীদের সাচ্ছন্দ সেবা গ্রহনের কোন সুযোগই থাকবে না।

অন্যভাবে যদি ব্যাপারটিকে ভাববার চেষ্টা করি, তখন মনটা সত্যি দুর্বল হয়ে যায়। মনে হয়, ভালো মন্দের বা যোগ্য অযোগ্যের বিবেচনাগুলো আসলেই কি ছিটকে পড়েছে আমাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে? ভেবে দেখুন, ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনালী একচেঞ্জ হয়েছে সেখনাকার ভৌগলিক ও জনসংখ্যার বিবেচনায়। ঠিক একইভাবে শিকাগোতে এমনকি নিউ ইয়র্কেও এবং এই সবকটি অঞ্চলেই কনস্যুলেট অফিসও বসেছে ঠিক ঠিক সংগত কারনেই। অথচ একই নিয়মে জর্জিয়াতেও সোনালী একচেঞ্জ স্থাপিত হলো, কিন্তু কনস্যুলেটের প্রশ্নে সেটা চলে গেল দেশের শেষ প্রান্তের মায়ামীতে ! আমার প্রশ্ন, যৌক্তিকতাকে দূরে ঠেলে ফেলে কেন এধরনের বৈষম্য বা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার নিষ্ঠুরতা ?

ফ্লোরিডায় কন্সুলেট স্থাপনের খবরটি এক বছর আগের পুরনো। মনে পড়ে, আটলান্টায় সেসময় ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ভ্রাম্যমান দূতাবাসের সেবা কর্মসূচীতে একটি দল আসে। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন অব জর্জিয়ার ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত বিউফোর্ড হাই ওয়ে ও শ্যাম্বলী টাকার রোডস্থ বেঙ্গল গ্রোসারী ষ্টোরের নিচ তলার মিলনায়তনে দুই দিনের ওই সেবা কার্যক্রমটিতে সেদিন গিয়েছিলাম সবার সাথে কুশল বিনিময়সহ খবর পরিবেশনের তথ্য সংগ্রহ করতে।

আটলান্টা শহরে একটি কনস্যুলেট অফিস স্থাপন করা যে ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে এই সময়ের একটি মোক্ষম দাবী, এই কথাটিই ভ্রাম্যমান দূতাবাসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও প্রথম সেক্রেটারি আশফাকুল নুমানের কাছে বলার চেষ্টা করেছিলাম সেদিন এবং অনুরোধ করেছিলাম এব্যাপারে দূতাবাসের কর্মকর্তা হিসেবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে। অথচ সেদিনই ধাক্কা খেয়েছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্যের খবরটি প্রথম তাঁর মুখ থেকে শুনে। আশফাকুল নুমান বলেছিলেন, “নীতিগতভাবে ফ্লোরিডার মায়ামীতে কনসুলেট অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্তটি সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত হয়ে আছে। কাজেই পাশের রাজ্যে আরেকটি অফিস স্থাপনের কোন চিন্তা-ভাবনাই এই মুহূর্তে সরকারের নেই”।

পরিস্কার মনে আছে, আমি তাঁর ওই মন্তব্যের উল্লেখসহ মিডিয়াতে নিউজ কভার করার পরও কমিউনিটিতে তেমন কোন প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করিনি গত বছর। কিন্তু গত কয়েকদিনের ব্যবধানে এই অঞ্চলের অনেকেই মনে করছেন সরকারের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কন্সুলেট দফতরটি খুব শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে ফ্লোরিডার মায়ামীতে। আর তাই জর্জিয়া রাজ্যসহ আশপাশের অঙ্গরাজ্যের প্রবাসীরা এই বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করেই সরব হয়ে ওঠেছেন। ফলে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন, ইমেইল, ফেস বুক, টেক্সটিং বা সভা সমাবেশে এই নিয়ে উচ্চবাচ্চ্য শুরু হয়েছে। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন পত্র লিখে গণ স্বাক্ষর সংগ্রহও শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। মোট কথা, যৌক্তিক অধিকার আদায়ে সর্বস্তরের সচেতন বিবেকগুলো নাড়া দিচ্ছে এখন।

গত কয়েকদিনে এই প্রসঙ্গটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বলতে গেলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রথম দাবী জানিয়ে পোস্টিং দেন এখানকার চিকিৎসক ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামীলীগের সহসভাপতি মুহাম্মদ আলী মানিক। আমি নিজেও আটলান্টায় কনস্যুলেট অফিস স্থাপনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরি। এরপর এগিয়ে আসেন মাহবুব ভূঁইয়া, গিয়াস উদ্দিন ভূঁইয়া, মানচিত্র নিউজ ও শনিবারের চিঠি নামের দুইটি অনলাইন মিডিয়া।

এছাড়া গত গত ২ নভেম্বর, শনিবার দুপুরেও অনুষ্ঠিত হয়েছে আটলান্টার বিভিন্ন সংগঠকদের অংশগ্রহণে অভাবনীয় একটি সভা। এখানে সবার আলোচনায় ঘুরে ফিরে একটি দাবীই সোচ্চার হয়ে ওঠেছে, আর সেটি এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী কনস্যুলেট অফিস স্থাপন। জর্জিয়া বাংলাদেশ সমিতির আয়োজনে সভাপতি মোস্তফা কামাল মাহমুদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এ এই রাসেলের পরিচালনায় ওইদিন সংগঠকদের মধ্যে মোহাম্মদ জামান ঝন্টু, মশিউর রহমান চৌধুরী, এম মওলা দিলু, ডিউক খান, মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন, নাহিদুল খান সাহেল, আরেফীন বাবুল, রুমী কবির, মামুন শরীফ, নজরুল ইসলাম, আহমাদুর রহমান পারভেজ, আরিফ আহমেদ, এম ডি নাসের, মিনহাজুল ইসলাম বাদল, আসীম সাহা, রশিদ মালিক, ওয়াসি উদ্দিন, ইউসুফ আলী পিন্টু, দেবযানী সাহা, সজল খান, রায়হান রাহী, সাদমান সুমন, মাহবুব আলম সাগর, অভিষেক শ্যাম, বাবু প্রমুখসহ অসংখ্য প্রবাসী তাদের দাবীর কথা উচ্চারণ করেছেন।

তাই একজন জর্জিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে আমিও একই সুরে সুর মিলিয়ে সবার সাথে সহমত প্রকাশ করে এই যুক্তিসংগত বিষয়টি পুনঃ বিবেচনা করার জন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানাই। ভৌগোলিক বিবেচনা থেকে অধিক বাংলাদেশির সেবা দিতে দেশের দক্ষিন-পুর্বাঞ্চলের প্রধান শহর আটলান্টাই এই কন্সুলেট স্থাপনের যথাযথ শহর বলে আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

কাজেই সত্যিকারের কল্যাণের কথা ভেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর চাইতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এই ছয় রাজ্যের প্রবাসিদের সেবা গ্রহণের সুযোগ করে দেবেন, এটাই আমাদের এসময়ের একমাত্র প্রত্যাশা।

আর সেটি সম্ভব না হলে ফ্লোরিডার পাশাপাশি জর্জিয়ার আটলান্টাতেও উল্লেখিত পর্যালোচনার আলোকে আরও একটি কন্সুলেট চাই আমরা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে এই বৃহৎ অঞ্চলের প্রবাসীদের যুক্তিসঙ্গত চাহিদা পুরণের সুযোগ তৈৱি করে দিতে পদক্ষেপ নেবেন, এটাও আমরা কামনা করছি।

রুমী কবিরঃ লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সভাপতি, জর্জিয়া বঙ্গবন্ধু পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র।

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!