লক ডাউন ও আমাদের সময়

55

রোকসানা পারভীন শিমুল

 

 

লক ডাউন শব্দটার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম বেশ আগেই। স্কুলে ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে শিখাতাম কিভাবে লক ডাউন করতে হয়। ওদেরকে শেখানো হতো বাইরের কোন আগুন্তক যদি ভিতরে ঢুকে ক্ষতি করতে আসে তখন তাদের কোথায় লুকাতে হবে ? কিভাবে নিঃশব্দে থাকতে হবে পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত ! কখন আবার স্বাভাবিক চলা ফেরা শুরু করতে পারবে? কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা ছোট্ট একটা ভাইরাস তার ভয়ে এভাবে সারা পৃথিবীর মানুষকে যে লক ডাউন করে থাকতে হবে দিনের পর দিন সপ্তাহ তিনেক আগেও ভাবিনি । ভাবিনি তখন প্রতিদিন গানিতিক হাড়ে বড় হবে এমন মৃত্যুর মিছিল । এখন একটা হাঁচি দিলেও মনে হয় আমি কি আক্রান্ত হয়েছি করোনা ভাইরাসে? নিজেদের ঘর দরজা বন্ধ করে যে যার মত হয়ে আছি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন । অফিস, কাজ, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকে হাঁপিয়ে উঠেছে। কয়েকদিন আগেও কেউ এই অখন্ড অবসরের কথা ভাবেনি। আমাদের ছোট বড় সবার জীবনটাই যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল । সেখানে ফুসরত ছিল না বাইরের কাজ, বাসার কাজ শেষে পরিবার পরিজনকে সময় দেয়ার। এখন বাসার চিত্র পুরো ভিন্ন ।
কানাডায় ১৩ই মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল মার্চ ব্রেক । করোনার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে ট্রুডো সরকার কাল বিলম্ব না করে ঘোষণা দেন লক ডাউনের। এতে আমাদের জন্য যে সুবিধাটা হয়েছে মার্চ ব্রেকে বাচ্চাদের একা একা ঘরে থাকতে হচ্ছে না। বাচ্চারা তাদের বন্ধের সময়টাতে কাছে পাচ্ছে বাবা মাকে এক সাথে। প্রথম দিকে আমার আট বছরের তাসিন খুব বোর হচ্ছিলো বাসায় বসে থেকে । প্রতি ঘন্টায় এসে আমাকে বলতো “ I am bored, what can I do?” আমি কিছুটা বিরক্ত হচ্ছিলাম একই প্রশ্ন শুনে শুনে। তারপর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো , কি করে এদের বোরনেস থেকে মুক্ত করা যায় । আমি সবাইকে বললাম আসো আমরা বাসায় একটা স্কুল বানাই । সেখানে আমরা সকাল থেকেই রুটিন ফ্লো করবো । প্রথমে দুই ছেলেই ভেটো দিলো এটা মার্চ ব্রেক বলে । আমি যখন বললাম একদিন এই স্কুলে এসেই দেখো কেমন লাগে ? তারপর সবার সম্মতিতে বড় ছেলে পনের বছরের ওয়ালিদকে দায়িত্ব দিলাম প্রতি দিন সে তার ভাইকে ঘন্টা দুয়েক পড়াবে । সেটা ম্যাথ হতে পারে বা গল্পের বই হতে পারে । এ সময়ে তার বাবা থাকবে সে স্কুলের প্রিন্সিপাল আর আমি এডমিন । আর সন্ধায় ওয়ালিদের টিচার হবে ওর বাবা । তাসিন হবে প্রিন্সিপাল আর আমি এডমিন। আমি এডমিন থাকছি এদের সুবিধা অসুবিধা , অবাঞ্ছিত ঘটনা আর খাবার সাপ্লাই দেয়ার জন্য । ওয়ালিদ রাজি হলো মাসিক বেতনের ভিত্তিতে। আর তাসিন রাজি হলো নতুন গেম কেনার শর্ত দিয়ে । এডমিন বলে কথা। ছাত্র শিক্ষক সবাইকেই খুশি রাখতে হয়। আমদের স্কুল শুরু হওয়ার কথা সকাল দশটা থেকে । প্রথম দিন তাসিন নিচে নামলো সকাল ৯ঃ৩০। টিচার আর প্রিন্সিপাল তখনো আসেনি। তাসিন নাস্তা সেরে যখন দেখলো তখনো হাতে পনের মিনিট আছে সে দৌড়ে চলে গেল উপরে খেলতে । ততক্ষনে টিচার আর প্রিন্সিপাল এসে পৌঁছেছে। ছাত্রের দেখা নাই । দশটা পাঁচ বাজে ছাত্র খেলতে গিয়ে ভুলেই গেছে স্কুলের কথা। সবাই এডমিনের কাছে জানতে চাইছে “ ছাত্র কোথায়? আমি তাদের আশস্ত করে বলি “ ছাত্র জ্যামে আটকা পড়েছে। অধৈর্য হওয়া চলবে না । অনেক ডাকাডাকির পরে ছাত্র নেমে আসে ক্লাশে । প্রথম দিকে তাসিনের ভাইকে টিচার হিসাবে মানতে কষ্ট হয় । ওয়ালিদ যেভাবে বলে তা তাসিনের পছন্দ হয় না। প্রথম দিকে চলে কান্নাকাটি । পরে পনের বিশ মিনিটের চেষ্টায় টিচার সফল হয় ছাত্রকে বাগে আনতে। এর পরের সময়টুকু ছাত্র শিক্ষক বেশ আনন্দপূর্ণভাবেই শেষ করে ক্লাশ। কিন্তু আমি দেখলাম সন্ধায় যখন তাসিন প্রিন্সিপাল সে খুব কঠিনভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে । সে চেয়ারে বসে আছে চুপচাপ । মাঝে মাঝে চক্কর দিচ্ছে ঘরের চারপাশ। আমি তাসিনকে জিজ্ঞেস করলাম “ তুমি হাট কেন?” সে আমাকে বললো “ Our principal did that.”
ওয়ালিদ দেখি ইচ্ছা করে ওর বাবাকে ক্রিটিকাল প্রশ্ন করে করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে। এক সময়ে সে প্রিন্সিপালকে জিজ্ঞেস করছে “Can you discharge this teacher?” তাসিন উত্তর করলো
“If you have any questions, you can talk to me. But you can’t talk like this.” আমি দেখলাম বাচ্চারা অনেক কিছুই জানে। হয়তো আমরা বুঝতেও পারি না তাদের জানার সীমানাটা। এখন তারা আর বাসায় বোর হয় না । নামাজের সময় দুই ছেলেই তাদের বাবার পাশে দাঁড়িয়ে যায় নামাজ পড়তে। সকালে নামাজের জন্য ডাকলেও এখন আর বিরক্ত হয় না । দাবা খেলায় বাবা মাকে হারাতে পারলে তাদের আনন্দ আর ধরে না । আমাদের পাশে বসে দেখে দেশ বিদেশের খবর । ওদের মনে থাকে হাজারো প্রশ্ন । এখন ওদের মুখ থেকে আর আমাকে শুনতে হয় না “I am bored”.

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!