সর্বশেষ

ফ্রাঞ্জ ফানোঃ তাঁর বই ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক’

177

 

ফ্রাঞ্জ ফানোঃ তাঁর বই ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক’

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র

 

ফ্রাঞ্জ ফানো(Frantz Fanon) ১৯২৫ সালে ২০ জুলাই ফ্রেঞ্চ উপনিবেশ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ মারটিনিক অঞ্চলে (Martinique) জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ব্ল্যাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৬১ সালে ম্যারিল্যান্ডে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উপনিবেশিক শোষণ শাসনে তিনি বেড়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন একজন আফ্রো-ফ্রেঞ্চ, দার্শনিক, চিকিৎসক মনোবিজ্ঞানী, সেইসাথে উপনিবেশিক বর্ণবাদ বিরোধী মানবতাবাদী ও রাজনীতিবিদ।

একসময় আফ্রিকা এশিয়াসহ সারা পৃথিবী ছিলো পশ্চিমাদের উপনিবেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের ফ্যাসিস্ট বাহিনী ফ্রান্স অবরোধ করলে তিনি ‘ফ্রি ফ্রান্স'(free France) আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়ায় স্বাধীনতার জন্য উপনিবেশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলে তিনি সেই আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি কার্ল মার্ক্সের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিলেন। সেসময় উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা বর্ণবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যে একধরনের অর্থনৈতিক শোষণজারীর মাধ্যমে প্রাথমিক পূঁজি সঞ্চয়ের (Primitive accumulation) উন্মত্ত উল্লাসে মেতে ওঠেছিল, তা তিনি খূব সহজেই বুঝতে পারতেন। তবে হাসপাতালে মনঃচিকিৎসক (psychiatrist) হিসেবে কাজ করার সময় ফেনন সম্পূর্ণ নূতন এক চিন্তা বা বৈজ্ঞানিক ধারনা সামনে নিয়ে আসেন, যে বিষয়টি নিয়ে এর আগে অন্যকোন দার্শনিক খুব বেশি কিছু বলে যেতে পারেননি। এখানেই ফানো ছিলেন অনন্য। তাই বর্ণপ্রথা থেকে শুরু করে যে কোন বৈষম্যের বিরুদ্ধে মুক্তমনের মুক্ত মানুষের মুক্ত পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন ও সংগ্রামে ফানো এখনো প্রাসঙ্গিক ও উল্লেখযোগ্য আলোচনার বিষয়বস্তু।

১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় ফানোর বিখ্যাত বই ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক'(Black skin white mask)। বইটি তিনি ডক্টরাল থিসিস হিসেবে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ‘বিতর্কিত’  হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপরও কালচারাল স্টাডিজ নামে জ্ঞানের শাখায় ফানোর চিন্তা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।

উপনিবেশ এবং উপনিবেশিক বর্ণবাদী শাসন-শোষণ বা নির্যাতন সেই অঞ্চলের মানুষের মনোজগতে যে এক গভীর ক্ষতিকর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে সেই বিষয়টি ফানো  তুলে ধরেন।

”Colonial racism assumed that colonized people were inferior to those of the ruling power and that their culture and values were also inferior.”  উপনিবেশিক বর্ণবাদ এই ধারনা দেয় যে উপনিবেশিত অঞ্চলের ‘মানুষরা নিম্নগোত্রিও’ এবং তাদের ‘সংস্কৃতিও নিম্নমানের’ ।

আর এই ধারনা থেকেই উপনিবেশিক শাসকরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি চিন্তা, মূল্যবোধ সেই অঞ্চলের মানুষদের উপর চাপিয়ে দেয়। কেবল তাই নয়, ‘ন্যাটিভ বা কালো আদমীদের’ সংস্কৃতি-চিন্তা ও ভাবধারা দৈনন্দিন জীবনধারণ প্রণালীকে প্রতিস্থাপন করার মধ্য দিয়ে শাসকের সংস্কৃতি ও ভাবধারাকে এক পর্যায়ে ডমিন্যান্ট কালচার ও ডমিন্যান্ট ইডিওলজি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

ফানো বলতে চান, উপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে মানুষের মনোজগতে মানসিক রোগের জন্ম হয় (Colonial racism has psycho-pathological effect), যার ফলে মানসিক ক্ষত ও আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। ব্যক্তি ও সামাজিক উভয় পর্যায়েই এই মানসিক ক্ষত পরিলক্ষিত হয়। ব্যক্তি মানুষ তার নিজস্ব আত্মপরিচয় (independent sense of  identity) নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়ে মানসিকভাবে ব্যাধিগ্রস্থ হয়। যেহেতু পশ্চিমা সাদা মানুষদের সংস্কৃতি ও গায়ের রঙ ‘পবিত্র’, ‘উন্নত’, ‘ভালোর’ সাথে তুলনীয় বলে প্রচার পায়, তাই কালো মানুষরা ভাবতে শুরু করে যে কালো মানেই ‘খারাপ, অপবিত্র, অনুন্নত ও শয়তান’ সমতুল্য। যার ফলে কালো মানুষরা নিজেদের সবকিছু অস্বীকার করে বিদেশী শাসকদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা আত্মস্থ করতে চেস্টা করতে থাকে। শুরু হয় নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সাথে দ্বন্দ্ব যাকে বলে নিজের সাথে নিজের বিচ্ছিন্নতা (alienation)। তাদের কাছে নিজেকে মনে হতে থাকে ‘নীচমানুষ’ (subhuman)। এইরকম এক বিপর্যস্ত মানসিক পর্যায়ে কালো মানুষরা সাদাদের মত হওয়ার বাসনা পোষণ করতে থাকে। নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে কালোরা তখন সাদা হয়ে যাওয়ার আকাংখা প্রকাশ করে।

ফানো বলেন যে, কালো মানুষরা এক অসম্ভব টানাপড়েনের (Impossible bind) ভেতর তখন আবদ্ধ হয়ে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যে, তারা তখন না পারে নিজের পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে, আবার না পারে অপরের বিদেশী সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে সমান মর্যাদা সম্পন্ন হয়ে উঠতে। এমনকি পশ্চিমা উপনিবেশিক দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদান ও অভ্যস্থ হওয়া সত্ত্বেও উপনিবেশিত অঞ্চলের ‘কালো আদমিরা’ কখনোই সাদা মানুষদের সমতুল্য হওয়ার মর্যাদা পাননা এবং ‘নিম্ন মানের মানুষই’ (subhuman) থেকে যান। একমাত্র সাদারাই ‘মানুষ’ (Human) এমন এক ধারনা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তা তখন কালো মানুষদের মনোজগতে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। তাদের ধারনা আরও দৃঢ়তর হয়ে নিশ্চিত করে যে, তারা সাদা নয়। তারা ‘নিম্ন মানুষ সাবহিউম্যান’ ।

যেকোন শোষণ ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেবল অস্ত্র দিয়ে নির্যাতনমূলক শাসন ব্যবস্থারূপে ( Repressive state apparatus) কার্যকর করতে পারে না। বরং ‘অসভ্য বা বর্বর দেশ, দেশের মানুষকে ‘উন্নত করার ‘মহান’, ‘পবিত্র’, ‘উচ্চ’ আদর্শকে (Ideological State Apparatus) কাঠামোগত ও আইনানুগভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তা টিকে থাকে।

দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে আজ বর্বর উপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে। কিন্তু বৈষম্য বা উঁচু-নিচুর চেহারাটি এখনো বহাল আছে । কেবল বর্ণবৈষম্যই নয়, বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবী জুড়েই বিস্তৃত আছে সাংস্কৃতিক বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য, ক্ষমতার বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। সকল বৈষম্যই মানুষের মনোজগতে গভীর ক্ষত ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। মনোজগতের এই ক্ষোভ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে আমেরিকা ইউরোপে বর্ণবাদ বিরোধী এই ক্ষোভের তীব্রতা পৃথিবীবাসী অবলোকন করছে। ভবিষ্যতে আরও অসংখ্য ক্ষোভের আগুন কোথায় কখন কিভাবে জ্বলে উঠবে তা কেবল সময়ই বলে দেবে। মানব জাতির এখন শুধু অপেক্ষার পালা।

মুরশেদুল হাকিম শুভ্রঃ  সাবেক চিকিৎসক, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ, লেখক, পরিবেশ, মানবতাবাদী সংস্কৃতি কর্মী, বর্তমানে আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী।

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!