নোবডি ওয়ান্ট আস

180

 

নোবডি ওয়ান্ট আস

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র

(এক)

১৯১৪ সাল। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীন। ‘কালো আদমিদের’ উপর চলছে অত্যাচার শোষণ। প্রায় ৩৭৬ জন ভারতীয়কে নিয়ে ‘কামাতাগা মারু (Kamataga Maru) নামে একটি জাপানিজ জাহাজ কানাডার বন্দর শহর ভ্যাঙ্কুভারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। জাহাজে যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন শিখ সম্প্রদায়ের ৩৩৭ জন, মুসলিম ছিলেন ২৭ জন আর হিন্দু ১২ জন। এদের মধ্যে গুরুদিত সিং(Gurudit Singh) ছিলেন একজন নেতা এবং ব্যবসায়ী, যিনি ভারতবর্ষকে ব্রিটিশদের কবলমুক্ত করার আন্দোলনের একজন প্রবাসী সংগ্রামী। যাত্রীরা ভেবেছিলেন ক্যানাডা কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে ব্রিটিশ শাসনে জর্জরিত ভারতীয়দের জন্য আশ্রয়স্থল হবে সেই দেশটি। তারা এটাও জানতেন দক্ষিণ এশিয়ার অধিবাসীদের জন্য সহজ হবে না ক্যানাডায় প্রবেশ করা। তারপরেও জীবনকে হাতে নিয়ে সুন্দর জীবনের আশা নিয়ে শুরু হয় তাদের সাগর যাত্রা।

হংকং থেকে ১৯১৪ সালের ৪এপ্রিল এই যাত্রা শুরু করে ‘কামাতাগা মারু’। প্রায় দেড় মাস পর মে মাসের ২৭ তারিখে ‘কামাতাগা মারু’ প্রবেশ করে ভ্যাঙ্কুভারের জলসীমানায়। কিন্তু জাহাজটিকে নোঙর করতে দেয়া হোল না বন্দরে। কেননা আগে থেকেই ক্যানাডায় দক্ষিন এশিয়ানরা যেন আসতে না পারে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিলো। ইমিগ্রেশন আইন কঠোর থেকে কঠোর হচ্ছিলো।

নিয়ম ছিল প্রত্যেক যাত্রীর কাছে থাকতে হবে ২০০ ডলার। আসতে হবে সরাসরি ভারত থেকে। যাত্রীরা অনেক দেন দরবার করেও কোন সমাধান খুঁজে পেলেন না। তবে এক পর্যায়ে ইমিগ্রেশন বিভাগ কর্তৃক ৩৭৬ এর মধ্য থেকে ২৪ জনকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হোল। বাকীদের প্রায় দুইমাস পর জুলাই মাসের ২৩ তারিখে ক্যানাডা বন্দর থেকে আবারও ফেরত পাঠানো হোল। সেসময় চলার পথে জাহাজ থেকে কেউ যেন ঝাঁপ দিয়ে বন্দরে পোঁছতে না পারে, সেজন্য কয়েকটা সামরিক নৌযান জাহাজটিকে অনেক দূর থেকে অনুসরন করতে থাকে।

সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখে জাহাজটি অবশেষে কলকাতা বন্দরে নোঙ্গর করে। তখন দেশদ্রোহিতার অপরাধে ২২ জনকে হত্যা করা হয়। আর ২০০ জনেরও বেশী ফেরত-যাত্রীদের স্থান হয় কারাগারের অন্ধকারে।

বহুল আলোচিত এই নির্মমতার ঘটনাটির জন্য ইতিহাসের চাকা ঘুরে প্রায় ১০০ বছর পর ২০১৮ সালেতে এসে এক বিস্ময়ের চমক দেখা গেল ক্যানাডার সরকারের পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টে ক্ষমা প্রার্থনা করেন সেদিনের সেই অমানবিক আচরণের জন্যে। ‘কামাতাগা মারু’র সেইসব যাত্রিদের কাছে এই ক্ষমার বাণী কোনদিনই পৌঁছাবে না। এরপরও ট্রুডো বলেছেন, ”Mr. Speaker, today I rise in this House to offer an apology on behalf of the Government of Canada, for our role in the Komagata Maru incident. More than a century ago, a great injustice took place ”

তিনি আরও বলেন ”No words can fully erase the pain and suffering they experienced. Regrettably, the passage of time means that none are alive to hear our apology today.”

(দুই)

১৯৩৯ সাল। জাহাজের নাম এসএস সেন্ট লুইস (SS St Louis)। যাত্রী সংখ্যা ৯৩৭। সবাই ইহুদী। সারা ইউরোপেই তখন চলছে ইহুদী বিদ্বেষ। হামবুর্গ থেকে মে মাসের ১৩ তারিখে জার্মানের তৃতীয় রাইখের হাত থেকে বাঁচার জন্য সেন্ট লুইস যাত্রা শুরু করে কিউবার উদ্দেশ্যে। দুই সপ্তাহ পরে সেন্ট লুইস হাভানা বন্দরে নোঙর করে।  তখন সেখানেও চলছিল অভিবাসী ও ইহুদী বিরোধী বিক্ষোভ। অনেকেই সেখানে ইহুদিদের ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে আখ্যা দেয়। অনেক দেন দরবার শেষে ২৯ জনকে সেই যাত্রায় হাভানায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। তারপর ৯০৭ জন যাত্রী নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করে সেন্ট লুইস। জাহাজ থেকে দেখা যাচ্ছিল মায়ামি বন্দরের অপূর্ব আলোক শোভা। জাহাজ থেকে যোগাযোগ করা হল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সাথে। কোন সাড়া পাওয়া গেল না। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে বলা হলো, অভিবাসী কোটা একেবারেই পূর্ণ। কাজেই অপেক্ষা করতে হবে ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী। ওইসময় বেশ আগে থেকেই কংগ্রেস এবং আমেরিকান জনগণ কোটার বাইরে ইহুদিদের অভিবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।  ১৯৩৮ সালের জরিপে জানা যায়, ৭১% আমেরিকান নাগরিক ইহুদী অভিবাসনের বিরুদ্ধে ছিল। এমনকি ইহুদী শিশুরাও যেন আমেরিকায় আসতে না পারে, তার বিরুদ্ধেও কংগ্রেস এবং জনগনের অবস্থান ছিল অটল। ইহুদীরা লোভী, জার্মান স্পাই, এমন সব অপবাদও দেয়া হয় সেসময়। কাজেই ফেরত পাঠান হলো সেন্ট লুইসকে। এবারেও জাহাজ থেকে কেউ যেন ঝাঁপ দিয়ে বন্দরে পৌছাতে না পারে, তা প্রতিরোধে কয়েকটা সামরিক নৌযান জাহাজটিকে অনেক দূর পর্যন্ত অনুসরণ করে যায়। জাহাজের একজন যাত্রী পরে যাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করা হয় তখন বলেছিলেন,”Nobody want us”

এসময় ‘সেন্ট লুইসে’র যাত্রীরা ক্যানাডায় যাওয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে আসে। কিন্তু ক্যানাডা থেকেও অপারগতা জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় একমাস পর বেঁচে থাকার আশা নিয়ে সাগরে ভেসে ভেসে অবশেষে বেলজিয়ামের বন্দরে ভিড়ে ‘সেন্ট লুইস’। ব্রিটেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স সরকার সকল যাত্রীদের ভাগাভাগি করে আশ্রয় দেয়।

কিন্তু দুঃখজনক যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে ঐসব অভিবাসীদের মধ্যে ২৫৪ জনের মৃত্যু হয় জার্মানের বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। ইতিহাসের চাকা ঘুরে আবারও আরও একটি বিস্ময়। ২০১২ সালে ইউ এস স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে ‘সেন্ট লুইসে’র যাত্রীদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিলেন তাদের কাছে এবং সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়।

(তিন)

পৃথিবীতে এখনো যুদ্ধ থেমে নেই। থেমে নেই নিরাপদ অভিবাসনের প্রত্যাশা। আর সেইসাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পরিবেশগত সংকট-সঙ্ঘাত, দুর্ভিক্ষ আর মহামারী এসে বিভিন্ন সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা, আরব ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে মানুষের জীবনকে করে তুলেছে বিপর্যস্ত, হতাসাগ্রস্ত। সুস্থ, স্বাভাবিক, নিরাপদ জীবনের আশায় লক্ষ মানুষ আজ পাহাড়, গিরিপথ, গভীর অরন্য, তপ্ত মরুভুমি, সাগরের পর সাগরের দুর্গম ও বিপদ সঙ্কুল পথ অতিক্রম করছে। এদের মধ্যে কেউবা খুঁজে পেয়েছে কাংখিত অভিবাসন। আবার কেউবা আছে জেলে। কেউ কেউ ফিরে গেছে নিঃস্ব হয়ে। কেউবা ভেসে গেছে জলে, সাগরের গভীর অতলান্তে। মাঝে মাঝে সাগরের ঢেউ তাদের কাউকে ঠেলে নিয়ে আসে তীরে। তাদের নিরব নীথর দেহ অনেক অভিমানে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে এইসব সাগর বেলায়।

মুরশেদুল হাকিম শুভ্রঃ লেখক, মানবাধিকার ও সংস্কৃতি কর্মী এবং সাবেক চিকিৎসক, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বসবাসরত।   

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!