সর্বশেষ

‘মাইজ মরা’ লেখালেখির যুগ

104

‘মাইজ মরা’ লেখালেখির যুগ

আনিসুর রহমান

বইমেলা চলছে। বইমেলা ঘিরে খবরগুলো অনেকটা সংখ্যা উপাত্ত আর আর আদিখ্যেতায় ভরা। এজন্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা শোচনীয় রকমের আনাড়ি। এ বিষয়ে আলাদা লেখা হতে পারে। আমি অন্য একটি বিষয়ে কথা বলতে চাই। এই যে বছর বছর হাজার হাজার বই বের হচ্ছে, এসবের সাথে সংশ্লিষ্টদের শ্রম ও ঘামে একটি পাণ্ডুলিপি- তারপর সেই পাণ্ডুলিপি থেকে বই আর এসব বইয়ের লেখকদের নিয়েই আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই।

আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে। উন্নয়নের অনেক সূচকে আমরা ঈর্ষণীয় অগ্রগতি অর্জন করেছি। যদিও মানবিক উন্নয়নে আশার কোনও খবর আমার জানা নাই। সংস্কৃতির অগ্রগতির খবর আরও হতাশাজনক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সংস্কৃতির জগতে আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। অনেকটা পিছিয়েছি এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগাতে পারিনি। পর্যাপ্ত অবকাঠামো পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি, ক্ষেত্রবিশেষে অনেক পরিকাঠামো আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যদিও সংস্কৃতি ঘিরে তথাকথিত ‘ব্যক্তিত্ব’ তকমাওয়ালা ব্যবসায়ী ঠিকাদারদের নানা পদ পদবী আঁকড়ে থাকার প্রবণতা বা গিলে খাবার দৃষ্টান্ত কম নয়। ছোট্ট একটা গল্প বলে মূল আলোচনায় ফিরে যাব।

দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের এক ডজন মোড়লের এক দম্পতির এক ছেলে সখ করে বনানীর মত বিলাসবহুল এলাকায় বড়সড় অ্যাপার্টমেন্ট রেখে এক পাল বিদেশি কুকুর পোষেন। কুকুর পোষা দোষের কিছু নয়। পারিবারিকভাবে আমরাও কুকুর পুষি। কিন্তু বিলাসিতা করে কুকুরের পেছনে কোটি টাকা খরচ করাও আভিজাত্য বটে। এই পরিবারে একাধিক সদস্য আবার লেখকও। এরা বিজ্ঞাপন ব্যবসা আর ঠিকাদারি করে কাড়ি কাড়ি টাকা করেছেন। বিয়েশাদিসহ পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি এরা বিদেশেই সারেন। ১৯৭১ সালে এই পরিবারের কর্তা পাকিস্তানি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন। তাহলে বোঝাই যায় স্বাধীনতা তাহাদের ভাগ্য কেমন করে খুলে দিল। মন্দ কী! অভিনন্দন। কিন্তু খটকাটা অন্য জায়গায়। এরাই যখন লিখেন এবং নাক উঁচু ছবক দেন।একবার রাস্তাঘাটে হাতপাতা মানুষ নিয়ে এই পরিবারের একজন বিরক্তি ঝেড়েছেন। তাতে নাকি আমাদের ভাবমূর্তি বলে কিছু থাকে না। বিদেশিদের সামনে আমাদের  মুখ থাকে না। কথা সত্য। তাই বলে কেউ খাবে, কেউ খাবে না- এটা কি চলতে পারে? রাস্তাঘাটে হাতপাতা মানুষগুলোরে পুনর্বাসন করার কর্মসূচি থাকলেই তো হয়। হয় না কি?

প্রসঙ্গ হলো, এই যে কুকুরবিলাসী পরিবারের লেখকরাও আমাদের কয়েক হাজার গ্রন্থপ্রণেতাদের মধ্যে একটা অংশ। এরকম আমলা লেখক, অধ্যাপক লেখক, ঠিকাদার লেখক, শিল্পপতি লেখক, পুলিশ লেখক, সেনা লেখক নানা কিসিমের লেখকের সমাহার আমাদের বইয়ের জগতে।এইসব বাহারি লেখকরা যদি তাদের নিজ নিজ এলাকার প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে লিখতেন, পাঠক হিসেবে আমরা উপকৃত হতে পারতাম।

ধরুন, একজন জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনযন্ত্র নিয়ে নানা অজানা বিষয় বা অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনার সূত্রপাত করতে পারেন, বই লিখতে পারেন। তেমনি রাজনৈতিক নেতা রাজনীতি নিয়ে, দেশ নিয়ে, গণমানুষের ভালোমন্দ নিয়ে, দেশে বিদেশের সঙ্গে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে, সেনা লেখকরা তাদের পেশা সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে, ঠিকাদাররা ঠিকাদারী নিয়ে, ব্যবসায়ীরা ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে, সংগীতজ্ঞতরা সংগীত নিয়ে এরকম নানা রকম বিষয় নিয়ে- তারা লিখুন।পর্যবেক্ষণ থেকে বলছি, হাল আমলে আমরা সকলে যেন সৃজনশীল লেখক আর বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছি। ফলে উপন্যাস, গল্প আর কবিতার বাম্পার ফলন হচ্ছে। একজন রাজস্ব কর্মকর্তা বছরে অর্ধডজন বই লিখে ফেলেন। এর বিপরীতে জাতলেখক বা পেশাদার লেখক আজ বিলুপ্ত প্রায়। যদিও আমাদের দেশে লেখালেখি কোন কাজ বা পেশা হিসেবে স্বীকৃত নয়। ধরুন, আমাকে একজন প্রশ্ন করল আপনি কী করেন?

লেখালেখি করি।

তা বুঝলাম। আর কী করেন?

আর কী করব?

চাকরি বাকরি? ব্যবসা-বাণিজ্য কিছু একটা।

এখন আমাদের দেশের লেখালেখি বা বইয়ের জগতে লেখককে কিছু একটা করতেই হবে, থাকতেই হবে। আর না থাকলেই তিনি অপাঙ্‌ক্তেয় অপ্রয়োজনীয়। এই কিছু একটা ইদানিং বেশ পাকাপোক্ত বা বড়সড় রকমের যেমন সচিব, বিচারপতি, উকিল, অধ্যাপক, নাট্য ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সম্পাদক, মহাপরিচালক, সভাপতি, ব্যবসায়ী ইত্যাদি। আর এরকম কিছু একটার ভিড়ে লেখালেখি জগতের আদিবাসীরা আজ প্রায় অস্তিত্ব সঙ্কটে। তাদের জায়গা নাই কোথাও। সাহিত্যে ‘কিছু একটা ওয়ালাদের’ দাপট, সাহিত্যের পাতায়ও তারা, পুরস্কারের তালিকাতেও তারা।

যে কারণে মার খেয়েছে লেখক প্রকাশক সম্পর্ক। প্রকাশকরা এখন আর প্রকৃত বা জাতলেখককে ধারণ করেন না। আধুনিক বিকাশমান সমাজে প্রকাশকরা প্রকাশনা ব্যবসার পাশাপাশি সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক দায় বা পরিকাঠামো নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এখানে পরিষ্কার করতে চাই, জাতলেখক বলতে জনপ্রিয় ধারার সস্তামানের রঙচঙা চর্বিওয়ালা লেখকদের বোঝাচ্ছি না। একজন দায়বদ্ধ প্রকাশক তার প্রকাশনার লেখককে তার প্রকাশিত বইয়ের বিপণন, তার ভবিষ্যতের লিখিতব্য বইয়ের বাজারের অগ্রিম ভিত্তি তৈরি করতে বইয়ের প্রচার, আলোচনা, সাহিত্য সাময়িকীর সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখকের সাক্ষাৎকার, বই ঘিরে সংলাপ, সেমিনার এমন কি বিভিন্ন সাহিত্য উৎসবে, বইমেলায় লেখকের অংশগ্রহণে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ স্থাপনের মত কাজগুলো আগ বাড়িয়ে করেন। বেশি দূরে যেতে হবে না, পাশের কলকাতা, নেপাল, শ্রীলঙ্কাতেও প্রকাশকদের এমন পেশাদারিত্ব আছে। দৃষ্টান্ত কেবল ইউরোপ আমেরিকার নয়।

আমাদের দেশে পেশাদার লেখককে ধারণ করে প্রকাশকের কয় টাকা লাভ? কিন্তু ‘কিছু একটা ওয়ালা’ লেখককে ধারণ করে প্রকাশকের যে দৃশ্য-অদৃশ্য লাভ, তা নিয়ে রীতিমত অনুসন্ধানী গবেষণা হতে পারে। এখন কোন জাতলেখককে প্রকাশকরা তেমনটা কদর করেন না। গণমাধ্যমের কর্মীরা বিশেষ করে বইমেলার সময় একজন জাতলেখকের খোঁজ করার চেয়ে বরং ‘কিছু একটা ওয়ালা’ লেখক এবং প্রকাশকদের পেছনে চোঙ্গা হাতে নিয়ে ঘুরঘুর করেন।

একটা প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। আপনাদের অনেকেরই ধারণা থাকতে পারে ঢাকা ক্লাবের সদস্য হতে কয় কোটি টাকা লাগে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, গত দুই দশকে কয় ডজন প্রকাশক ঢাকা ক্লাবের সদস্য হয়েছেন? কেমনে কী? আমার মাথায় ঢোকে না।

‘কিছু একটা ওয়ালা’ লেখকরা অতীতের প্রসববেদনায় বড়ই কাতর। বর্তমানের বিষয়ে এরা বোবা। আর ভবিষ্যতের বিষয়ে এরা অন্ধ। যতটা আত্মতৃপ্তি এদের লেখাজোকায় দৃশ্যমান ততটা গভীর মনোবিশ্লেষণ হাল আমলের লেখালেখিতে পাওয়া যায় না। ব্যতিক্রম থাকলেও থাকতে পারে। আমি জানি না, কেউ নজরে আনলে পড়ে দেখতে চাই।

একটা ঘটনা উল্লেখ করব। কয়েকদিন আগে জনপ্রিয় এক লেখিকা বইমেলা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় একটা দৈনিকে নাতিদীর্ঘ একটা লেখা ছেপেছেন। লেখার মোদ্দা কথা হচ্ছে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা হয় বলে তার বিবাহবার্ষিকী আর বইমেলা একসঙ্গে উদযাপন করেন। মহামারীর জন্যে বইমেলা এবার মার্চ মাসে হবার কারণে বিবাহবার্ষিকীটা এবার বইমেলায় উদযাপন করা হলো না। বড়ই আফসোস। এমন লেখাও লিখতে হলো, পত্রিকাটি তা আবার ছাপল। ভাবতে ভালই লাগে দেশ এগিয়ে চলছে। এগিয়ে চলছে আমাদের লেখালেখিও!

জাতলেখক বা পেশাদার লেখকদের দাঁড়াবার জায়গা কোথায়? প্রকাশনার বাইরে একজন পেশাদার লেখক প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য সংগঠন বা লেখকদের ইউনিয়ন, সাহিত্যসাময়িকী বা পত্রিকা এবং রাষ্ট্রীয় এবং নানা দাতব্য এবং সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট বা লেখালেখির পক্ষে পৃষ্ঠপোষকতামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের দাঁড়াবার জায়গা করে নিবেন। সভ্য গণতান্ত্রিক আধুনিক সমাজে এমনটাই রীতি। আমাদের দেশে লেখকদের জন্যে সেরকম পেশাদারী সংগঠন বা ইউনিয়ন নাই। যৎসামান্য দুই একটা আছে, জাতীয় কবিতা পরিষদসহ, তা পেশাদারী দায়বদ্ধতার জায়গায় নাই। এসব সংগঠনের আড়ালে কেউ কেউ পদ পদবী ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকা মানুষদের নির্লজ্জ তোষামোদ করে সামন্ত লালসা চরিতার্থ করেন।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সাময়িকীও নাই। যাও দুই একটা আছে তাও আবার প্রতিষ্ঠিত মানুষদের আরো প্রতিষ্ঠা দেবার কাজে ভূমিকা রাখে। ব্যতিক্রম লিটল ম্যাগাজিন। অনেক সময় কিছু কিছু ছোট কাগজ বড় কাগজের লেজ হিসেবে কাজ করে। বড় কাগজের সাহিত্যপাতাগুলো দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া ‘মাইজ মরা’ কেরানিসূলভ ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালিত হয়। অনেকক্ষেত্রে এসব পাতা অপেশাদারি কর্পোরেট সিন্ডিকেট রক্ষা করে চলে। বাকি থাকে একাডেমি, গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা কর্তৃপক্ষ। সেসব জায়গায়ও পেশাদারি লেখকদের ঠাঁই খুব একটা নাই। বাংলা একাডেমি স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হবার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর বর্তমান আইনকানুনের ফাঁকফোকর দিয়ে পরিচালিত হয় অনেকটা অন্যান্য যে কোন সরকারি প্রথিষ্ঠানের মতই। এর পরিষদে লেখকদের প্রতিনিধিত্ব সামান্যই। এমনকি লেখকদের ভোটে নির্বাচিত লেখকদের প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও প্রায় দেড় দশক যাবৎ এই প্রতিনিধি নির্বাচন হয় না। এসব নিয়ে কথা বলার মত মাইজটুকুও আমাদের লেখকদের নাই। বাংলাদেশ শিশু  একাডেমি আরেক কাঠি সরেস। এটি বহুলাংশে আমলাপোষ্য একটি প্রতিষ্ঠান। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও লেখকদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। অনেকটা অকর্মণ্য একটি প্রতিষ্ঠান।

পর্যাপ্ত গ্রন্থাগারেরও বড় অভাব আমাদের দেশে। আর বিদ্যমান গ্রন্থাগারগুলোর যথেষ্ঠ সংস্কার, আধুনিকায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি পেশাদারি লেখালেখির অনুকূলে আনার জন্যে যথেষ্ট কাজ করার সুযোগ রয়েছে; বই বাছাই থেকে অন্যান্য আনুষঙ্গিক কর্মযজ্ঞ সাজানোর ব্যাপারে। আমাদের দেশে লেখালেখিতে পেশাদারিত্বের জন্যে পশ্চাদপদ রক্ষণশীল জায়গাগুলো হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাহিত্য বিভাগ। এসব বিভাগের পণ্ডিতজনেরা লেখকদের নানা আয়োজনে সভাপতির আসনসহ নানা জায়গার দখল নিলেও তাদের নিজ নিজ বিভাগে কোন লেখককে আমন্ত্রণ জানানোর কোন চর্চা কি তারা শুরু করতে পেরেছেন? প্রশ্নটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েই শুরু করা যায়। আধুনিক বিশ্বে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে এবং শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগে লেখক নিয়োগ দেওয়া বা অতিথি লেখকের পদ চালু করা হয়। পদের আনুষ্ঠানিক নামই থাকে ‘লেখক’। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বহুলাংশে অর্বাচীন মাস্টারদের হাতে জিম্মি। এসব নিয়ে ভাবার ক্ষমতা তাদের নাই, সময়ও নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুবাদ ব্যুরো ব্যর্থতার আরেকটা উদাহরণ।

এমনকি নগর সংস্থাও ‘লেখক’ নামে কর্মস্থান সৃষ্টি করে। এই পদের কর্মস্থল থাকে নগরের গ্রন্থাগার আর কাজ থাকে লেখালেখি আর বই পঠন বিষয়ে নগরের আগ্রহী মানুষদের নানা প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং পরামর্শ দেওয়া। অনেক কিছু আমাদের দেশেও কেন সম্ভব নয়? অধ্যাপকদের জন্যে জাতীয় অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অধ্যাপক থাকতে পারলে লেখকদের জন্যে অনুরূপ পরিকাঠামো কেন সম্ভব নয়? বাধা হলো প্রতিষ্ঠিত মানুষগুলো। প্রতিষ্ঠিতরা তো এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত। তাই নতুন কোন সুযোগ তৈরি তাদের বড় অনাগ্রহ। তাতে তাদের একচেটিয়া খবরদারী থাকবে না।

নানা বিতর্ক আর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে সাহিত্যের পুরস্কারগুলোও মর্যাদা হারিয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের প্রতি পাঠকের আর বাড়তি আগ্রহ জাগে না। অবস্থাটা এরকম- বার বার চুন খেয়ে মুখ পুড়তে পুড়তে, এখন দই দেখেও ভয় করে। প্রতি বছর ডজন ডজন লেখক বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেলেও সারা বছর ধরে তাদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন আলোচনা হয় না। তাদের বইও আলাদা কোন নজর কাড়ে না। কারণ কী? অই যে ‘মাইজমরা কিছু একটা ওয়ালা’ লেখকদের ব্যাপারে পাঠক বড়ই নিরাশ। তাদের বলার তেমন কিছু নাই। দেবারও নাই। কেবল আছে নেবার- পদ, পদবী, পুরস্কার, পদোন্নতি, প্লট, বিদেশ ভ্রমণ, মালিকানা ও মনোনয়ন।

এত কিছু সামাল দিয়ে লেখক হিসেবে তাদের ‘মাইজ’ আর থাকে না। লেখালেখি একটা অভ্যাসের ব্যাপার। বিরামহীন লেগে থাকা। জীবনের সমান সময় চাই লেখালেখির জন্যে। সেখানে একজন মানুষ রাত দিন সবকিছু সামলে, তারপর লেখালেখিও করবেন। লেখালেখি কি এতটা মামুলি কাজ?

আমি একটু খোলাসা করতে চাই। একজন সরকারি আমলা যার দৈনন্দিন কাজের এমন ধরন- প্রায় প্রতিটি বাক্যের শুরু এবং শেষ হয় ‘স্যার’ শব্দটির অতি ব্যবহার দিয়ে। তারপর সেই তিনিই যদি পত্রিকার পাতায় বুদ্ধিদীপ্ত ছবক দিতে যান, কেমনে কী হবে? ওই লেখার কি মাইজ থাকবে? পত্রিকার পাতাগুলো ওল্টালেই বোঝা যাবে এরকম ‘মাইজ মরা’ কত লেখার ছড়াছড়ি।

দেশে গ্রন্থনীতি, ভাষানীতি, অনুবাদ নীতির অভাবে যাচ্ছে তাই অবস্থা, ভুল বানান আর ভুল ভাষার ছড়াছড়ি। খোঁজ নিয়ে দেখুন ভাষায় যাদের দখল আছে, লেখায় যাদের হাত আছে, তাদের কাজ নাই, চাকরি নাই। পত্রিকা আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্পাদক বা কর্তা হয়ে আছেন মালিকদের আত্মীয়, পোষ্য অথবা কর্পোরেট আজ্ঞাবহ লোকজন। আর ১৯৬০-১৯৭০ দশকে দেশের গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় জায়গায় যাদের অবস্থান ছিল, তারা ছিলেন দেশের সেরা লেখক বুদ্ধিজীবীরা। উদাহরণ দিলে পরিস্কার হবে। নামগুলো হচ্ছে শামসুর রাহমান, আবদুস সালাম, ওবায়দুল হক, আহসান হাবীব, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত, নির্মল সেন, সিরাজুদ্দীন হোসেন, জহির রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার, রাহাত খান, কেজি মুস্তাফা, এবিএম মূসার মত প্রতিভাবান মানুষগুলো।

এখনকার ‘মাইজ মরা’ লেখকরা কার্যকর বিতর্ক তৈরির অবকাশ না নিয়ে ফেইসবুককে জীবনের তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর এই তীর্থভূমিতে জুটিয়ে নিয়েছেন নিজস্ব লাইক আর মেল্লছগোষ্ঠী। এসব লেখকদের ফেইসবুকে লাইক আর ইনবক্সের খবর নিতে দিনমান গুজার। ফলে পেশাদারি লেখালেখির সুযোগ অবারিত হবার পরিবর্তে সংকোচিত হয়েছে। ফ্রিল্যান্স লেখালেখির সুযোগ তলানীতে এসে ঠেকেছে। সরকারি নথি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদ, সচিবালয় আর গবেষণার সর্বত্র ভাষার ভুল ব্যবহারের ছড়াছড়ি। দায়িত্বশীল মহল থেকে শুদ্ধাচার চর্চার কথা বলা হয়। ভাষার শুদ্ধাচার কি কোন শুদ্ধাচার নয়? আর শুদ্ধাচারের প্রবর্তনে পেশাদার লেখকদের জন্যে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিভিন্ন দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে কেউ কেউ পরষ্পরের স্বার্থে পুরস্কারের জন্যে নাম প্রস্তাব করেন। তাতে কাজও হয়। পুরস্কার পেয়েও যান। দেখা গেল এক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরেক প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের নাম প্রস্তাব করলেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ওই মহাপরিচালক তার পরিচালক বন্ধুর জন্যে একটা পুরস্কারের ব্যবস্থা করে দিলেন। এরকম অনেক গল্প অসমর্থিত সূত্রে চালু আছে। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার কয়েক ডজন প্রকাশিত বই নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে কয়েক ডজন প্রকাশক। মন্দ কী? বইয়েরও বাম্পার প্রকাশনা হয় বটে। কোন কোন প্রকাশক পদহীন লেখকের বই এমন কি বিদেশি সংস্থার বই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ফেলে রাখে। অপর দিকে মন্ত্রী, সচিব আমলাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরে। তাদের টেলিফোনের শব্দে লাফ দিয়ে উঠে। এহেন চর্চা আর বাস্তবতায় পেশাদার লেখালেখি বিলুপ্ত প্রায়।

অপেশাদার লেখকদের থাকে ধান্দা? প্রকৃত লেখকের ধান্দার রূচি থাকে না, যোগ্যতাও থাকে না, সময়ও থাকে না। এসব ধান্দার যোগ্যতা থাকে হাইব্রিড অলরাউন্ডার আমলা, অধ্যাপক পণ্ডিত, ব্যাংকার-ঠিকাদারদের।

ফরমায়েশি লেখা লিখে ফরমায়েশকারীর কাছ থেকে পাঁচ হাজার বা দশ হাজার টাকা পাবে সরাসরি মজুরি বা বাহবা হিসেবে। আর পরোক্ষে পুরস্কার প্লট, ভ্রমণসহ অনেক সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে ফরমায়েশের বাইরে পত্রিকা থেকে একটি লেখার জন্যে যদি টাকা পাওয়াও যায়, তা মাত্র দুই হাজার টাকা। কোনটায়  বেশি লাভ? লেখকের মাইজ মরবে না তো কার মরবে? পত্রিকার পাতাগুলো অপেশাদার পদধারী, পদবীধারী লেখকের ছড়াছড়ি। জাতলেখকের লেখা চোখে তো পড়ে না। কেন পড়ে না, কারণ কী? এসব নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

অর্থনীতির একজন সাংবাদিকের অর্থবাণিজ্যের যে বিশ্লেষণ; একজন ক্রীড়া সাংবাকিকের খেলার খবরের যে বিশ্লেষণ, সেরকম দৃষ্টান্ত কি আমাদের লেখালেখির জগৎ ঘিরে আছে? কেন নাই? এর কারণটাও খুঁজে বের করতে হবে।

এখন যারা লিখতে পারেন, লেখার ক্ষমতা যাদের আছে চাকরির বাজার তাদের নাই। বড় পদধারী লেখকদের লেখা ভুলেভালে ভরা থাকলেও সমস্যা নাই। ওইগুলো ঠিকঠাক করে দরকার হলে আবার লিখে পত্রিকাগুলো ছাপাবে। পদের একটা ব্যাপার আছে না। একটি সাহিত্যপাতা বিশ্বব্যাংকের এক ভদ্রলোকের বিরক্তিকর একটি লেখা দিনের পর দিন ছেপে যাচ্ছে। কেন তাকে লিখতে হবে? কেন তা ছাপতে হবে? মাথায় ঢোকে না।

লেখালেখির জগতের এমন অবস্থা, যেন রাজার হস্ত করে নেয় সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। রাজতন্ত্র নাই গণতন্দ্রের নসিহতে আছে বড় বাড় বাড়ন্ত আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রের এরা এখন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি… কী না? একের ভেতরে সব।

সবের ভেতরে সেরা।

এরা গাছেরটাও, তলারটাও।

বিপরীতে লেখকের দাঁড়াবার জায়গাটাও কি থাকবে না? বঙ্গবন্ধু এসব ভেবেই লেখক ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু লেখক ট্রাস্ট এখন চালু না করা হলে, কবে চালু করা হবে?

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!