সর্বশেষ

একজন বারবারা লী

206

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর থেকেই প্রগতিশীলসহ প্রায় সকল মিডিয়াতে এসংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। যেমন এত টাকা খরচ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের কি প্রাপ্তি যোগ হলো ?  কিংবা আফগান নারীদের এখন কি হবে ? ইত্যাদি।

সকল কিছুই বিবেচিত হচ্ছে মার্কিন পটভূমি থেকে।আফগানিস্তানে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পঞ্চাশ হাজার । আর ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু সত্য এই যে, আফগানিস্তানের ক্ষত এবং ক্ষতি নিয়ে খুব একটা আলোচনা নেই।

মূল বিষয় যে “মার্কিন ইমপেরিয়াল গ্র্যান্ড স্ট্রাটিজি”(Imperial Grand strategy) নিয়ে তেমন কোন কথা নেই। ভবিষ্যতে কম খরচ করে, কম হতাহতের মধ্যমে দ্রুততার সাথে যদি এই ‘ইমপেরিয়াল স্ট্রেটিজি’ বাস্তবায়ন করা যায় তাহলেই যেন ঠিক আছে।

পরদেশ দখল কক্ষনোই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সোভিয়েত দখলে আফগান নারীদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো ছিল। এই বিষয় নিয়ে মার্কিন মিডিয়াতে তেমন কোন আলোচনা নাই। স্নায়ূযুদ্ধের সময় আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের নিয়ে আঁতাত গড়ে তোলে  সেই সব মুজাহিদিনের একজন প্রধান ক্রিমিনাল গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, যার মাধ্যমে মেয়েদের উপর এসিড নিক্ষেপ শুরু হয়। পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই গুলবুদ্দিন হেকমতিয়েরকে সকল রকম সাহায্য সহযোগিতা করেছিল।

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত উৎখাতের জন্য যা করা দরকার – তা যদি মানবতা বিরোধীও হয়, তাই করেছিলেন। একই লিগেসি ধারন করেছেন পরবর্তী সকল রাস্ট্রপতি।

টুইন টাওয়ার ধ্বংস ও প্রায় তিন হাজার নিরপরাধ মানুষের হত্যাযজ্ঞের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী পুঁজিবাদী রাস্ট্রযন্ত্র ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের’ ( war on terror) নামে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনে যে অমানবিক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে, তাতে প্রায় আট ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয় এবং দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। যুদ্ধের মধ্যে মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশন দুই ভাবে পুঁজি সঞ্চয় করে। যখন যুদ্ধ হয় তখন আর যখন পুনঃনির্মান হয় তখন। ওয়ার অন টেররের ভূত  এখন খোদ মার্কিন দেশে প্রবেশ করেছে। “প্যাট্রিয়ট এক্ট, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি থেকে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক সামরিকীকরন থেকে শুরু করে পুরো দেশকেই পুলিশিকরন করা হচ্ছে। বর্ণবাদ ৯/১১র পর আরো ব্যাপকতা পেয়েছে। জনগনের উপর নজরদারী বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আফ্রিকান এমেরিকানদের “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার”  আন্দোলন শুরু হয়েছে। তবে একথাও সত্য যে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যত ক্ষুদ্রই হোক, সেই সংগ্রাম কার্যকর আছে সারা পৃথিবীসহ পূজিবাদী দেশগুলোর একেবারে পেটের ভেতরেই।

২০০১ সালে সেপ্টেবরের ১১ তারিখ টুইন টাওয়ারে আক্রমণের পরপরই যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ মার্কিন কংগ্রেসে আলোচনা শুরু হয় প্রেসিডেন্ট বুসকে যুদ্ধ ঘোষণা করার “ব্যাপক এবং একক ক্ষমতা” ( Expansive powers to to use military force ) দেওয়ার জন্য। সিনেটে তা পাশ হয় ৯৮-০ ভোটে।

সেসময় ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়ার একমাত্র  ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস প্রতিনিধি বারবারা লি (Barbara Lee) হাউজ ফ্লোরে তাঁর আবেগ জড়িত কাঁপা কন্ঠে যুদ্ধের বিরুদ্ধে  “না” ভোট প্রদান করেন। তিনি বলেন, “যে শয়তানি গ্রহণযোগ্য না, তা আমরা করতে পারি না” ( Let us not become the evil that we deplore”)। ভোটের ফলাফল ছিল যুদ্ধের পক্ষে ৪২০। বিপক্ষে একমাত্র বারবারা লী। মার্কিন কংগ্রেসে তিনি ছিলেন একজন আফ্রিকান এমেরিকান নারী প্রতিনিধি।

এই ভোটের পর  প্রায় ২০ হাজার ইমেইলে তাঁকে কমিউনিস্ট, বিশ্বাসঘাতক ও ভীরু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নাই। তাই ১২ বারের মত মার্কিন কংগ্রেসে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নীতি ও আদর্শকে চেতনার গভীরে ধারণ করে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন।

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র
সাবেক চিকিৎসক, বরিশাল মেডিকেল কলেজ, বরিশাল, সংস্কৃতি কর্মী, মানবতাকর্মী ও সংগঠক।    
আটলান্টা, জর্জিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।  

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!