বই পর্যালোচনা – “এলোমেলো ভাবনা” নাকি এলো মেলা ভাবনা

55

মুন্সি রফিকুল ইসলাম সাচ্চু

 


তরুণ প্রবাসী রাজেন্দ্রিয়ান কবি রোকসানা পারভীন শিমুল তার প্রথম বই ‘এলোমেলো ভাবনা’ সাজিয়েছেন ৫৭ কবিতায়। নাম থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় সংকলনে বিষয়বৈচিত্র্য রয়েছে। অর্ধাংশের বেশী কবিতার মূল উপজীব্য ভালবাসা। তাই ‘এলোমেলো ভাবনা’তে আমরা মূলতঃ এক ভালবাসার কবিকেই খুঁজে পাই। আর ভালবাসার কবিতাগুলোর বেশীরভাগেই রয়েছে অপূর্ণতা-বিরহ- বিচ্ছেদ-হাহাকার-আহাজারি; যাকে কবির নিজস্ব ব্রান্ড বলে ধরে নেয়া যেতে পারে, অন্তত এ বইয়ে! এধরণেরই একটি কবিতা ‘এলোমেলো ভাবনা’কে বইটির নাম হিসেবে ব্যবহার করায় এ ফোকাসটি আরো স্পষ্ট হয়েছে। এদিক থেকে বইটির নামকরণ সার্থক হয়েছে। তবে ভালবাসা ছাড়াও তার কবিতায় রয়েছে সমাজ-সচেতনতা, স্মৃতিকাতরতা, প্রকৃতি, পরিবার আর মাতৃত্বের স্বর্গীয় মূর্চ্ছনাসহ নানান কিছু! তাই এলোমেলো ভাবনা নয়, বরং বইটি সম্পর্কে বলা যেতে পারে, মলাটের ভেতরে আমাদের জন্য এলো মেলা (গোছানো, শিল্পিত) ভাবনা!

কবিতার ইংরেজি প্রতিশব্দ Poetry এর উদ্ভব হয়েছে গ্রিক Poiesis থেকে, যার অর্থ ‘নির্মাণ’। সাহিত্যের আদিমতম শাখায় নবীন কবির নির্মাণ-কুশলতা পাঠককে সহজেই কাছে টেনে নেবে বলে আশা করছি! উদাহরণ হিসেবে নীলাঞ্জনা আর শুভঙ্করের পত্ররূপে লিখিত কবিতাগুলির কথা বলা যায়। ‘নীলাঞ্জনার চিঠি’ ভালবাসার এক স্বপ্নলোক, শৈল্পিক নিবেদন সৃষ্টি করেছে। ‘শুভঙ্করের চিঠি’তে নীলা দ্বিধান্বিত, আশা-শঙ্কার দোলাচলে সহসা সে খোলেনা চিঠি! ‘নীলার চিঠি’তে যেন ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমিকি সেই আগের মতই আছো, নাকি অনেকখানি বদলে গেছো?’ ‘নীলার দ্বারে শুভঙ্কর’- আহা, তবুও দেখা মিলল না! কী মধুর কষ্ট! ‘এলোমেলো ভাবনা’ যেন আরেকটি ‘নীলার চিঠি’! ‘আমাদের কথা’ আগামীর স্বপ্নে ভালবাসার ডানা মেলে, স্থান-কাল-পাত্র অতিক্রমের আকুতি প্রকাশ করছে! ‘তোমাদের চলে যাওয়া’য় বেড়ে যায় বিরহ, অভিমান! ‘কোনো একদিন’ গতিশীল ভালবাসা নিজের শূণ্যতায় এ পৃথিবীর ছবি আঁকে; প্রেমাস্পদের ছবি কেমন হবে – আজি হতে শতবর্ষ পরে, তা যেন রবীন্দ্রনাথের মতই আঁকতে চেষ্টা করে!

 

কুন্তক বলেছেন, “কবিতা হলো এমন এক প্রকার রচনা, যাতে শব্দ আর অর্থ, ধ্বনি আর ব্যঞ্জনার সংশ্লেষ ঘটে।” রোকসানা পারভীন শিমুল তার প্রকাশিত প্রথম বইয়ের কবিতাগুচ্ছে বেশ সাবলীল দক্ষতার সাথে এই সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন! ‘প্রজাপতি ভালবাসা’ এক গভীর প্রেমমদির আহবান, সাধ্যি কার, তা উপেক্ষা করে! ‘সপ্ত সুরে বাজাও বাঁশি’ ভালবাসার ছন্দ-রঙ-সুর চেনার চেষ্টারত। ‘আরশির পেছনের আমি’তে তারুণ্যের স্মৃতিকাতরতা, আবার প্রৌঢ়ত্বে এসে যেন পৃথিবীর কাছে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় অনুভব করা – যেনবা কবিগুরুর সোনার তরীতে ‘ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই, ছোট সে তরী/আমারই সোনার ধানে গিয়েছে ভরি!’ ‘ভাঙনের শব্দ’তো অনেকটা পল্লীকবির কবর কবিতার শিমুলীয় সংস্করণ! ‘হিসেবের খাতা’য় জীবনের সান্তনা, ফিরে আসা, ফিরে পাওয়া! ‘পাহাড় ও দেবশিশু’তে জীবনের অভিজ্ঞতা পাহাড় সমান! ভালবাসা সে পাহাড়কে নাড়িয়ে দেয়, ছাড়িয়ে যায়। শৈশব-স্মৃতিকাতর ‘লালঘুড়ি’! ‘বৃষ্টিকথন’ আর ‘স্বপ্ন’ অনুপম রোমান্টিক, ছন্দে দোলানো কবিতা। বৈকুণ্ঠের বাঁশি: চীরঞ্জীব স্বপ্নভঙের বেদনায় নীল।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের উপলব্ধি, “সৌন্দর্য সৃষ্টিই হলো কাব্যের উদ্দেশ্য।” তরুণ কবির কবিতাগুলোতে আমরা সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। প্রথম কবিতা অর্ঘ্য, তরুণ মনের প্রেম নিবেদন আর আশায় বুক দুরুদুরু অপেক্ষা! অথবা বিচ্ছেদের পর মিলনের জন্য আহাজারি, যেনবা হুমায়ুন আহমেদের ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়……’। নাইবা হলাম: বিরহ, বিচ্ছেদ, অভিমান, দ্বিধার অনুপম প্রকাশ। আশির্বাদ: অপ্রাপ্তির প্রতিচ্ছবি। ইন্দ্রজালে: প্রেমাস্পদের প্রতি ফিরে এসেছে আস্থা আর নির্ভরতা। সুখ আর দুঃখ হচ্ছে জীবনের চরম বাস্তবতা, এই সান্তনা ফুটে উঠেছে ‘বেদনার কাব্য’তে! স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দেওয়ায় চরম উচ্ছ্বাস; আস্থা আর ভালবাসার বিজয়-কেতন উড়েছে ‘প্রতীক্ষা’য়! ‘পাতা ঝরা দিন’-এ ‘পাখির নীড়ের মতো দু’টি চোখ’ নিয়ে যেন অপেক্ষা ঘরণীর! ‘ভোরের আলো’তে প্রেমে তারুণ্যের অস্থিরতা, অভিসারের জন্য উন্মুখতা ফুটে উঠেছে!

রবীন্দ্রনাথ এর উপলব্ধি, “নিজের প্রাণের মধ্যে, পরের প্রাণের মধ্যে ও প্রকৃতির প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করিবার ক্ষমতাকেই বলি কবিত্ব।” ‘সপ্তসুরে বাজাও বাঁশী’তে কবি নিজের ও পরের মনের মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। ‘আকাশ ও মেঘের গল্পে’ প্রকৃতির মনের মাঝে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন! বিখ্যাত কবি Wordsworth বলেছেন, “Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings.” শিমুলের কবিতায় সেই দুর্নিবার আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ পাঠককে টানে সহজেই! ‘স্বপ্ন’ ঠিক তেমনি একটি কবিতা। Samuel Taylor Coleridge বলেছেন, “Poetry – the best words in their best order.” আমাদের প্রিয় কবির যাত্রা সে পথেই, সে লক্ষ্যেই! বিশেষতঃ তার এ বৈশিষ্ট্য শক্তিশালী হয়ে ধরা দিয়েছে তার ক্লাসিক ছন্দোবদ্ধ কবিতাগুলোতে।

জয়ীতাদের কথা, ক্ষণজন্মা আর শিরোনাম কবিতায় নারী-অবমাননা, রাজনৈতিক সহিংসতা আর পাশবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কলম ধরে কবি তার সমাজ-সচেতনতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘সাততারা মঞ্জিল’ আর ‘তুই না এলে’ কবিতায় মাতৃত্বের স্বর্গীয় মহিমা চিত্রিত হয়েছে সন্তানের দৃষ্টিতে, আবার মায়ের অনুভবে! এখানে কবির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার শিল্পকুশলতায় হয়ে উঠেছে শ্বাশ্বত অনুভূতির নিরন্তর প্রতিধ্বনি! তবে ‘সাততারা মঞ্জিল’ পড়ে মাকে মনে পড়ায় মন যেন গেয়ে ওঠে – সবাই বলে, ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে; খুঁজে দেখ, পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে! কবিতাটি পড়ে William Wordsworth এর কবিতা We are Seven-এর কথাও মনে পড়ে, যেখানে কবির প্রশ্ন, “Where are they? I pray, you tell.” জবাবে অবুঝ পল্লীকন্যা তার সাত ভাইবোনের কথা কবিকে শুনাচ্ছে, She answered, “Seven are we; /And two of us at Conway dwell, /And two are gone to sea.”/

এলোমেলো ভাবনার প্রতিটি কবিতাই পরিণত। সুপাঠ্য। উপভোগ্য। প্রতিটি কবিতাই মেলা ভাবনাকে মেলে ধরে। তবুও আমার অনুভবে সবচে এগিয়ে আছে ‘সোনা রোদ’! এর শব্দ, ব্যঞ্জনা, রূপক, চিত্রকল্প, স্টাইল, বক্তব্যে একজন পাঠক হিসেবে আমি প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছি, আলোকিত হয়েছি, আনন্দ লাভ করেছি, আচ্ছন্ন হয়েছি।

কবিতাকে চিনতে গেলে, পাঠ করতে গেলে কবিকেও চেনা জরুরী বৈকি! শুধু নির্মোহভাবে শিল্পের আলোচনা কাম্য হলেও পর্যালোচনাকারীর সীমবদ্ধতায় ব্যক্তি-আলোচনাও চলে আসে। ইরানী রাজকন্যার নাম ছিল রোকসানা, যার অর্থ প্রভাতের উজ্জ্বল তারকা। পারভীন অর্থ সাত তারকা-সম্বলিত নীলাম্বরী কৃত্তিকা নক্ষত্রগুচ্ছ। শিমুলতো বাংলার উজ্জ্বল লাল চোখ-ধাঁধানো ফুল। ব্যক্তি পরিচয়েও আমাদের কবি সাত তারকা -ভাইবোনের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা। কবি শিক্ষা-বসবাস-যাপনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় পুষ্ট! শৈশব-কৈশোর মফস্বল শহরে কাটলেও, যৌবন থেকে গোলার্ধের ওধারের উন্নত শহরে, সাগরের ধারে, প্রকৃতির কোলে! জীবনের প্রতিটি স্তরের-স্থানের-সময়ের অভিজ্ঞতাই কম-বেশী ধরা দিয়েছে তার কবিতায়। তিনি মানুষে-মানুষে ও মানুষে-প্রকৃতিতে আর প্রকৃতিতে-প্রকৃতিতে কী মেলবন্ধন রয়েছে, তা খুঁজতে চেষ্টা করেছেন!

কবিতা আর নারীর মাঝে মিল রয়েছে বিস্তর। দু’টিকেই বুঝতে পারা মুশকিল! কবিরাজ জগন্নাথ বলেছেন, “যে শব্দ রমণীয়, তাইই কাব্য।” আশা করছি, শিমুলের অধিকাংশ কবিতায় রমণীয় শব্দের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবে পাঠক। আচার্য বামন বলেছেন, “পদ রচনার বিশেষ রীতিই হলো কবিতার আত্মা।” রীতির দিকে চোখ ফেরালে বলতে হয়, এলোমেলো ভাবনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ কবিতায় ক্লাসিক অন্ত্যমিল থাকলেও, শিমুল প্রধানতঃ আধুনিক ধারার অমিত্রাক্ষর পরিমণ্ডলে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। কবির ধ্বনি-শব্দ-ভাষা, ব্যঞ্জনা, রূপক, চিত্রকল্প, ছন্দ, স্টাইল, বক্তব্যে তার কবিত্ব-ক্ষমতা জ্বলে উঠেছে বেশ উজ্জ্বল হয়ে। আমরা এই ক্ষমতার সাবলীল বিকাশের আশায় থাকলাম, নিরন্তর শুভ কামনা তার আর তার কবিতার জন্য। আশা করছি, তার কবিতাগুলো পাঠ করার মাধ্যমে পাঠক অনুধাবন করার চেষ্ট করবে তার কবিতার আত্মাকে! আর তাযে কবির আত্মিক সৌন্দর্যেরই প্রতিফলন!

কবি তার বইয়ের ফ্লাপে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘শতবর্ষী রাজেন্দ্র কলেজ: আমার ভালবাসা’ গ্রুপ থেকে উৎসাহ পেয়ে তিনি বই প্রকাশে এগিয়েছেন। তিনি এজন্য শ্রদ্ধেয় রানাস্যারসহ গ্রুপের সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। আমরা আশা করব, তার মত আরো লেখকরা লেখা দিয়ে গ্রুপটাকে সমুন্নত রাখবে, আর বই প্রকাশে এগিয়ে আসবে। গভীর কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধেয় রানাস্যারকে এরকম একটি কবি-লেখক তৈরির কারখানা তৈরির জন্য। গ্রুপের সবাইকে শুভ কামনা, আশা করছি তারা রাজেন্দ্রিয়ান কবি-লেখকদের বই বেশি-বেশি করে সংগ্রহ করবেন!

এলোমেলো ভাবনা প্রকাশ করেছে, পরিবার পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদপটে সাদা বুনন, যা হয়তো রীতিবদ্ধ শব্দ-গাঁথুনির রূপক! তার উপর কালো, অবিন্যস্ত বঙ্কিম রেখাবলী যেন কবির এলোমেলো ভাবনাকে আর কাব্যিক সৌন্দর্যকেই প্রকাশ করছে, যা চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে বইটির নামের সাথে। বঙ্কিম রেখাবলীর মাঝের রক্তিম রেখাদ্বয় যেন কবি ও কবিতার হৃদয়। ইঙ্গিত পাওয়া যায় এলোমেলো ভাবনার গভীরে, কেন্দ্রে রয়েছে ভালবাসা। আবারও শুভ কামনা কবিকে, তার প্রথম বইটির প্রকাশনার সাথে যুক্ত সবাইকে! বইটির বহুল প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করছি!

# মুন্সি  রফিকুল ইসলাম  সাচ্চু, /

গ্রন্থ পর্যালোচক,লেখক ।‏

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!