বালি ট্যুর - মেঘের আড়ালে সুর্যের লুকোচুরি

361

সেলিনা চৌধুরী

 

সকালে উঠে আকাশ দেখছি।মেঘের আঁড়ালে সূর্যের লুকোচুরি। সোনালি ছটার রেশ আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। হোটেলের ছোট্ট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হালকা রোদের আমেজ গাঁয়ে মাখছি।
“মলিনমুখে ফুটুক হাসি,
জুড়াক দু’নয়ন
মলিন বসন ছাড়ো সখি
পড় আভরণ।”
ধীরে ধীরে মেঘের বসন ছেড়ে প্রকৃতি আলোর আভরণে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে।

আজ জলের উপর ভাসমান দুটো মন্দির দর্শন করব। সকাল সকাল হোটেল লবিতে প্রাতঃরাশ সেরে, সারাদিনের টুকটাক সরঞ্জাম নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।শহর থেকে দূরে, অনেক দূরে গাড়ি ছুটছে। ধীরে ধীরে পথ উর্দ্ধমুখে উঠছে। ছোট ছোট গ্রাম, খোলা মাঠ পেরিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছি।পথের দুপাশে লক্ষ্য করছি প্রায় দশ মিটার লম্বা উঁচু উঁচু বাঁশের তৈরী, নারকেল পাতা দিয়ে সজ্জিত সরল,সহজ শৈল্পিক ঝালর। শহরেও পথের পাশে, হোটেলগুলোর মুখে দন্ডায়মান এই শিল্পকর্ম চোখে পড়েছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের পথে প্রায় প্রতিটি বাড়ির কপাটের মুখে এই বাঁশের শিল্পকর্মের উপস্থিতি আমাদের কৌতূহল বাড়িয়ে দিল।আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এই ঝালর; লোকাল ভাষায় “পেঞ্জর” এর ঐতিহ্য বর্ণনা করল। এই পেঞ্জর পবিত্র পর্বতের রূপক। সৃষ্টিকর্তার প্রতি বালিনিজদের সখ সমৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের প্রতীক। গালুঙ্গান, বালিনিজদের ধর্মীয় দিবস, অধর্মের উপর ধর্মের বিজয় উদযাপন দিবস। এ উপলক্ষে সাতদিনব্যাপী এই বিশালাকার হস্তশিল্প তৈরী করা হয়। এর চূড়ার বেঁকে যাওয়া নারকেল পাতার সাথে সংযুক্ত একটি পাত্রে শস্য, ধান, নারকেল, শশা এবং এগারোটি মুদ্রা সৃষ্টিকর্তার ভেট হিসাবে নিবেদন করা হয়।
ধর্মের প্রতি বালিনিজদের নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত উপভোগ করতে করতে আমরা এগুচ্ছি। যত উপরে উঠছি, শীত বাড়ছে। চাঁদর গাঁয়ে জড়িয়ে নিলাম তিনজন।
প্রায় ১২০০ মিটার উঁচুতে বালিনিজদের পবিত্র পাহাড়। পাহাড়ের উপর সমতলে লক্ষীমন্ত, শান্ত ব্রাতান হ্রদ। হ্রদের উপর ভাসমান দেবী দানুর মন্দির ” উলুন দানু টম্পল”। ব্রাতান হ্রদ বালির সৌভাগ্য আর সমৃদ্ধির উৎস। নিম্নাঞ্চলের কৃষিকর্মের জন্য পানি এই উৎস থেকে প্রবাহিত হয়।
গাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে যেতেই স্নিগ্ধ, শান্ত হ্রদের টলটলে নীলাভ জলে পাহাড়, মেঘ আর মন্দিরের প্রতিবিম্ব দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। শান্ত হ্রদের ধার ঘেষে অপ্রবেশ্য মন্দির আর তার দুটো ছোট রেপ্লিকা। আমি ছুটে ছুটে যাচ্ছি, এই জায়গার, ঐ জায়গায়, ” এখানে আমার একটা ছবি তুলে দাও”; ” ইশ, তুমি এখানে দাঁড়াও আমি তুলে দিচ্ছি।”
একটা স্কুলের গ্রুপ study tour এ এসেছে। আর একটি সংগঠনের art competition হচ্ছে। জান্নাত আপা আর শুক্লাদি ছাত্রছাত্রীদের সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। শিক্ষকেরা মনে হয় স্কুল ইউনিফর্ম দেখলেই শিক্ষার্থীদের ছাত্র বানিয়ে ফেলে। ছাত্রছাত্রীদের সাথে photo session ও সম্পন্ন। এবার ফেরার পালা।
গন্তব্য এখন ” তানাহ লট টেম্পল “। বালির অন্যতম আকর্ষন এই তানাহ লট টেম্পল। আমি ভাবছি, দানু টেম্পল যা দেখলাম, এর চেয়ে বেশি আর কি সুন্দর হতে পারে।তখনো জানি না, কি বড় বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

তানাহ লট এলাকায় পৌছুলাম। সব ট্যুরিস্ট স্পটের মতই এলাকাজুড়ে রকমারি দোকান।টিকেট কাঁটার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি, কথা বলছি তিনজন অনর্গল। এক ভদ্রলোক কৌতুহলী চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন।
” আপনারা বাংলাদেশী?” “জ্বী”। ” আমি আসছি আমার বউ বাচ্চা নিয়া”, ভাষায় বিক্রমপুরের টান স্পষ্ট। দেখলাম খুব সহজ সরল ছিমছাম হাসিখুশি মহিলা এবং তাদের বিভিন্ন বয়সী চারজন ছেলেমেয়েতার সাথে। ” আমার ইউরোপে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এত বড় পরিবার, টিকেট ভাড়ায় সব টাকা চলে যায়। তাই বালি আসলাম। আপনাদের মত একা আসতে পারি না। বাচ্চাদের মায়ের জন্য মন কেমন করে। বাচ্চার মার আবার বাচ্ছাদের জন্য মন পুড়ে”। পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা আর সারল্যে মুগ্ধ হলাম।
” কেমন দেখলেন তানাহ লট টেম্পল ?” ” আপা আমি তিন ঘন্টা এক জাইগায় বইসা ছিলাম, আপা আমার মত মানুষের চোখে পানি আইসা পড়সে। আমার পয়সা উসুল আপা। আপনারা তাড়াতাড়ি যান। জোয়াড় আইসা পড়লে আর ঢুকতে পারবেন না মন্দিরে”।

টিকেট করে সমুদ্রের ধারে চলে এলাম। হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছি। উত্তাল সাগরের মাঝে কালো পাথরের এক মন্দির। প্রবল ঢেউ মন্দিরের গাঁয়ে ঘনঘন আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের প্রহার উপেক্ষা করে পাথুরে মন্দির নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। আমি সাগরে নেমে গেছি। জোয়াড়ের জল বাড়ছে, আর কিছুক্ষণ পর জল ডিঙ্গিয়ে মন্দিরে যাওয়া যাবে না। গাইডের হাত ধরে জল ডিঙাচ্ছি; আমি ছোটখাটো মানুষ, বুক পর্যন্ত জল উঠে যাচ্ছে। হাতে ব্যাগ, ব্যাগে টাকা পয়সা, পাসপোর্ট ; কোন হুশ নেই আমার। মন্দিরে পৌছুতে হবে। জান্নাত আপা আমার পিছে। শুক্লাদি দোনামোনা করতে করতে নেমে পড়ল। ভেজা শরীরে মন্দিরে পা দিলাম। পুরোহিতরা পবিত্র জলে মুখ ভিজিয়ে দিল, মাথায় জল ছিটাল, কাঁনে গুজে দিল কাঁঠালচাপা আর কপালে তিলক। তিনজন মন্দিরের পাশের কালোপাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। মূল মন্দির অপ্রবেশ্য। সাগরের ঢেউ দেয়ালে আছড়ে পড়ছে, প্রবল জলের ছেটায় ভিজে চুপচুপ আমরা। সাগরের মাঝে, পাথুরে মন্দিরে, কানে কাঁঠালচাঁপা গোজা আমরা তিন কপালকুন্ডলা, শুধু নবকুমারেরা নেই।
জোয়াড়ের জল বাড়ছে। ফিরতে বেগ পেতে হবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও নেমে আসলাম।গাইডের হাত ধরে ফিরে আসছি। অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। আমার আকুলতার ছিটেফোটাও আমার লেখনীতে ফোটাতে পারলাম না।

সমুদ্রের পাশে উঁচু টিলাতে উঠে গেলাম। টিলাটা পার্কের মত সাজানো। সুর্যাস্তের দিকে মুখ করে বসার জায়গা। সুর্য ডোবার পালার জন্য অপেক্ষা করছি। ধীরে ধীরে মেঘের রঙ কেমন পাল্টাতে শুরু করেছে। হলুদ, তারপর আর একটু গাড় হলুদ, তারপর কমলা, তারপর কমলার উপর লালের ছটা; সমস্ত আকাশ যেন আবীর ছড়ানো। সূর্য ডুবছে। মেঘের আড়ালে সূর্য ঢেকে গেছে; আমাদের দুর্ভাগ্য। সূর্যাস্ত দেখা আর হল না। আকাশের ঐ রঙের খেলার ঝলক নিয়ে ফিরে আসছি। কারো মুখে কোন কথা নাই। জান্নাত আপা, শুক্লাদির মুখে রঙের মায়া, আমি জানি আমিও সারাদিনের রঙগুলো আমাতে ধারণ করে ফিরে চলেছি।

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!