সর্বশেষ

নারী নির্যাতন।। উৎস অনুসন্ধান

184

নারী নির্যাতন উৎস অনুসন্ধান

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র

নারীকে অবমাননা, অসম্মান, নারীর প্রতি শোষণ নির্যাতন এক প্রাচীন ব্যাধি যার উৎস রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিঘাতের ভেতর পাওয়া যাবে। গ্রীক মিথলজিতে পাওয়া যায়, দেবতা প্লট দেবরাজ জিউসের কন্যা সুন্দরী প্রসারফিনাকে অপহরণ করে ধর্ষণ করেছিলেন। ‘রেপ অব প্রসারফিনা’ নামে রোমের জাদুঘরে মার্বেল পাথরে নির্মিত বারনিনির সেই মূর্তির মাঝে ফুটে ওঠে টক্সিক মাস্কুলিনিটি আর সেই মাস্কুলিনিটি থেকে নারীর বন্দিত্বের ভয়ার্ত আর্তনাদ। প্রাচিন ধর্মগ্রন্থে নারীকে পুরুষের উপর অশুভ প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। আদম ও ইভের কাহিনী থেকে জানা যায় আদমকে আপেল খেতে প্ররোচিত করেছিলো ইভ।

বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহনে সবার অংশগ্রহনের নিশ্চয়তা বিধান করেছিলেন কেবল নারী ও কৃতদাস ছাড়া। ফ্রেঞ্চ রেভলুশন ১৭৮৯ সালে রাজতন্ত্র ও গির্জাতন্ত্রকে অপসারণ করে মানুষের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছিলো। কিন্তু ঘোষনা হয় ‘All men are created equal’। ফ্রান্সে নারীরা ভোট দেওয়ার অধিকার পায় ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাধিকারের ২৪ বছর পর। ১৭৭৬ সালে বিজয়ের পর মার্কিন সংবিধানে বলা হয়েছিল সবাই সমান কেবল নারী ও ক্রীতদাস ছাড়া। ইউরোপের এনলাইটেন্মেন্ট, ফ্রান্স বিপ্লব ও মার্কিন বিপ্লব সভ্যতাকে অগ্রসর করেছে, কিন্তু তাতে নারীমুক্তি আসেনি। নারীমুক্তি অর্থাৎ মানবমুক্তির আশা সঞ্চার করেছিল ১৯১৭ সালে রূশ বিপ্লবের মাধ্যমে। সেই সময় থেকে নারীর ভোটাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারীর অংশগ্রহন ঘোষিত হয়েছিলো।

পৃথিবীব্যাপী পুঁজিবাদী রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি বৈষম্য-কেন্দ্রিক এক অসম ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে। দারিদ্র ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকায় ব্যাপকভাবে নারীরা নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। মুনাফা কেন্দ্রিক রাজনীতি-বাণিজ্য নারীকে পণ্যে পরিণত করেছে।

সারা পৃথিবীব্যাপী এবং বাংলাদেশে নারীকে ধর্ষণ এবং হত্যা কেবল ‘টিপ অব দ্যা আইসবার্গ’। সমাজ সংসারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে যায় নারী নির্যাতনের হাজারো অজানা কাহিনী। বলপ্রয়োগের নিষ্ঠুর কাঠামোকে ভিত্তি করে রাস্ট্রের রাজনীতি অর্থনীতির যে বুনিয়াদ গড়ে ওঠে, নির্যাতনের মনস্তত্ব গড়ে ওঠে সেখান থেকেই। বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল, ভোটকেন্দ্র দখল, ভূমিদখল, নদী দখল, খাল, বিল, জলাশয়,বনভুমি দখল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাম্পাস দখল আর বলপ্রয়োগে নারীর শরীর দখল একই সূত্রে গাঁথা। আইনহীনতার সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে যে পুরুষ নির্যাতক হয়ে ওঠে, তা দীর্ঘদিনেরই প্রস্তুতি। কাজেই কেবল কয়েকজন ধর্ষককে শাস্তি দিলেই নির্যাতক মানব প্রেমিক হয়ে উঠবে না। মূলত দৃষ্টি দিতে হবে নির্যাতনের সংস্কৃতির দিকে।

নির্যাতন বা এবিউজ কেবল শারীরিক হতে পারে তাই না। হতে পারে মৌখিক। ফিজিক্যাল এবিউজ, সেক্সচুয়াল এবিউজ ও ভার্বাল এবিউজ- বাংলাদেশে এই সকল এবিউজ প্রক্রিয়া শুরু হয় পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাথমিক শিক্ষাক্রম থেকে। ‘মাইরের উপর ঔষধ নাই’ কিংবা ‘দুই ঘা দিলেই সব ঠিক’, সমাজে, স্কুলে এবং গৃহে এই সকল অমানবিক প্রক্রিয়ায় আগামীদিনের নির্যাতক মানসিকতা তৈরী হয়। যে সন্তানটি শিক্ষক বা পরিবারের কারো দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়, সে সন্তানের মানসিক গঠন স্বাভাবিক হয় না। সমাজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকার ভিত্তি যদি হয় বলপ্রয়োগ, আচরনগত সংস্কৃতিতে যদি যুক্ত হয় আঘাত করার মানসিকতা, সেই সমাজ হবে নির্যাতকের ব্রিডিং গ্রাউন্ড।

আচরণগত সংস্কৃতি বস্তুত সংস্কৃতির সর্বচ্চো রূপ। আজকাল ধাপ্পাবাজি, অন্যকে ঠকানো, প্রতারণা, বিশ্বাসহীনতা, বাগাড়ম্বর, সাম্প্রদায়িক মনোভাব, অপরকে অপদস্ত করা, এম্বারাস বা অপ্রস্ততু পরিস্থতিতে ফেলে দেয়া, মিথ্যা কথা বলা ও অন্যের প্রতি বিবেচনাহীনতা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপ পেয়েছে। এমন বাস্তবতায় বলা যায়, রাস্ট্র নিজেই নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

ধর্মকে ব্যবহার করে ধর্মভিত্তিক প্রচার প্রচারণায় নারীকে অসন্মান করে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে বহু বছর ধরে। নারীকে ”তেতুল”, ‘বৈদ্যুতিক তার”, কলা ইত্যাদি নিম্নমানের উপমায় অপমান করা হচ্ছে, শাসক শ্রেণীর নাকের ডগায় এমনকি তত্ত্বাবধানে এসব হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার রাজনীতিতে এদেরকে ব্যাবহার করা হচ্ছে। নারীর প্রতি এই অসন্মান ও বিদ্বেষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহরে। নারীর প্রতি বলপ্রয়োগের মানসিকতাও জন্ম নিচ্ছে একই হারে।

অথচ এই পৃথিবীতে নারীকে ছাড়া কোন সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। নারীকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিয়ে কোন জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়নও সম্ভব নয়। নারীর মুক্তিই জাতির মুক্তি। নারীর মুক্তি হচ্ছে মানব মুক্তি। নারীর উপর নির্যাতন সমগ্র জাতির উপরই নির্যাতন।

আমাদের অর্থনীতির চাকা কারা সচল রেখেছে? ৮০ শতাংশ রপ্তানি বাণিজ্য কাদের দ্বারা অর্জিত হচ্ছে ? নিম্ন মজুরীর, নিম্ন আয়ের সেই সব নারী-শ্রমিক যাদের শোষণ করে অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত মুল্য লুন্ঠন করে নিচ্ছে কিছু ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর ভুমিকা ও অবদানের কথা আমরা কি ভুলে গেছি ? কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র ভাষায় “এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত”? দুই লক্ষ অশ্রু নদী?

রাস্ট্রভবন কবে ঘেরাও হবে জানি না। তবে একদিন, ”আমি সেই মেয়ে” যেমন লিখেছিলেন কবি শুভ দাসগুপ্ত …

”বীভৎস দাবানলের মত
আমি এগোতে থাকবো! আর আমার এগিয়ে যাবার পথের দুপাশে
মুণ্ডহীন অসংখ্য দেহ ছটফট করতে থাকবে-
সভ্যতার দেহ
প্রগতির দেহ-
উন্নতির দেহ-
সমাজের দেহ
হয়ত আমিই সেই মেয়ে! হয়ত! হয়ত বা।”
মুরশেদুল হাকিম শুভ্রঃ লেখক, মানবাধিকার ও সংস্কৃতিকর্মী এবং সাবেক চিকিৎসক, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বসবাসরত।

আরও সংবাদ
error: Content is protected !!